জোসনা বেগমের চোখে ছিলো ক্লান্তি, কণ্ঠে দুর্বলতা। বয়স ৩৮। দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন। কিন্তু নিয়মিত চেকআপ তো দূরের কথা, সুযোগটাই ছিল না। তিনি থাকেন পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার এক দূরবর্তী গ্রামে, যেখানে নিকটস্থ হাসপাতালে যেতে সময় লাগে কয়েক ঘণ্টা। এমন অবস্থায় আশার আলো হয়ে এসেছিল একটি স্যাটেলাইট ক্লিনিক। গ্রামের কাছেই, হাঁটাপথে পৌঁছানো যায়। চেকআপে ধরা পড়ে তার অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে রেফার করা হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, যেখানে সঠিক চিকিৎসায় এখন তিনি সুস্থ।
এমনই অনেক গল্প জমেছে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চারটি ইউনিয়নে; গলাচিপা, রতনদি তালতলি, গোলখালী ও গজালিয়া। এখানে ২০২৫ সালের মে-জুন মাসে ‘স্যাটেলাইট ক্লিনিক’ কার্যক্রমের আওতায় ৮০টি পিভিসিকে অন্তর্ভুক্ত করে ৬৪টি ক্লিনিক পরিচালিত হয়। দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য এই সেবাদান পদ্ধতি এক নতুন আশ্বাস। ৯৬০ জন নারী, শিশু, কিশোর-কিশোরী ও বয়স্ক রোগী এই সেবা গ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্যে ৩২ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালে রেফার করা হয়। উদ্যোগটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে, পিকেএসএফ-এর সহযোগিতায় এবং ওয়েভ ফাউন্ডেশনের বাস্তবায়নে পরিচালিত ‘পাথওয়েজ টু প্রসপারিটি ফর এক্সট্রিমলি পুওর পিপল (পিপিইপিপি-ইইইউ)’ প্রকল্পের অংশ। যার মূল লক্ষ্য অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের অন্তর্ভুক্ত গর্ভবতী নারী, দুগ্ধদানকারী মা, কিশোর-কিশোরী, পাঁচ বছরের নিচে শিশু এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবা নিশ্চিত করা।
মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, প্রশিক্ষিত নার্স, পুষ্টিবিদ ও স্বেচ্ছাসেবীসহ প্রায় ১৩ সদস্যের এই টিম প্রতিটি স্যাটেলাইট ক্লিনিকে নিয়মিত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। গর্ভবতী ও প্রসূতি নারীর চেকআপ, শিশুদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও চর্মরোগের চিকিৎসা, কিশোরীদের গাইনোকোলজিক সেবা, বয়স্কদের বয়সজনিত রোগ শনাক্তকরণ এবং প্রতিবন্ধীদের প্রয়োজন অনুযায়ী রেফারেলসহ স্বাস্থ্যসেবার পরিধি এখানে যথেষ্ট বিস্তৃত। এই সেবাগুলো দুর্গম অঞ্চলে পৌঁছে দিতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা সহজে বোঝা যায় না। সেখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাস্তার অবস্থা, কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ প্রাকৃতিক অবস্থা, সব মিলিয়ে প্রতিটি ক্লিনিক আয়োজনের পেছনে রয়েছে একদল নিবেদিতপ্রাণ মানুষের নিরলস পরিশ্রম। এছাড়াও, শিশুদের ওজন পরিমাপ, অপুষ্টি শনাক্তকরণ, পুষ্টিকর খাদ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সচেতনতা তৈরির কাজও চলছে প্রতিটি ক্লিনিকে। কোনো রোগীকে রেফার করা হলে তাঁদের ফলোআপ নিশ্চিত করা হয়। এই প্রকল্প জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন, বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ এবং কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহ সহ বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রমেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে। বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ কার্যক্রমও চালু আছে এসব ক্লিনিকে।



