নারায়ণগঞ্জ জেলার তারাবো পৌরসভার খালপাড় এলাকার আমজাদ হোসেনের মেয়ে রিনা আক্তার। ৪ বোন ও ৩ ভাইসহ মোট ৭ ভাই-বোনের মধ্যে ৬ষ্ঠ রিনা এবং বোনদের মধ্যে সবার ছোট। বাবা আমজাদ হোসেন পেশায় একজন তাঁতি। তাই ছোট থেকেই বাবার কাছ থেকে তাঁতে জামদানি বোনার বিভিন্ন কৌশল রপ্ত করেন রিনা। ৭ ভাই-বোনের সংসারে চরম আঘাতটা আসে রিনার ১০ বছর বয়সে। সে সময় বাবাকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন রিনা ও তার পরিবার। জীবনের তাগিদে সব ভাই বোনেরা যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে চলতে থাকে রিনার জীবন।
বাবা মারা যাওয়ার পর বাবার তাঁতটা টিকিয়ে রাখতে পারেনি রিনার ভাইয়েরা। তাই বাধ্য হয়েই অন্যের তাঁতে মজুরি ভিত্তিতে কাজ করতে থাকেন রিনা। ইতিমধ্যে রিনার বিয়ে হয় দুলাল মিয়ার সাথে। দুলাল মিয়া স্থানীয় একটি টেক্সটাইল মিলে চাকরি করেন। অন্যের তাঁতে কাজ করে যে মজুরি পান, তা থেকে অল্প কিছু টাকা জমিয়ে মাত্র ১৮০০ টাকা দিয়ে একটা তাঁতের কাঠ কিনে টু-পিস তৈরি শুরু করেন রিনা। ধীরে ধীরে টাকা জমিয়ে একটা-দুইটা করে তাঁত বাড়াতে থাকেন তিনি। স্বামী দুলাল মিয়ার চাকরি চলে গেলে তাকেও কাজ শিখিয়ে নিজের সাথে জামদানি বোনার কাজে লাগান। কাস্টমারের চাহিদা অনুযায়ী, তাদের দেখানো ডিজাইন মোতাবেক জামদানি বুনে সাপ্লাই দিতে থাকেন।
করোনার সময় একেবারেই কাজ বন্ধ ছিল রিনার। যে মহাজনের কাছে শাড়ি বিক্রি করতেন, তিনি করোনাক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ায় ক্ষতিটা আরও বেশি হয়। মহামারীর সময় সব মিলিয়ে প্রায় আশি থেকে নব্বই হাজার টাকার ক্ষতি হয় তার। এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য রিনা ও তার স্বামী আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিশ্রম শুরু করেন এবং ওয়েভ ফাউন্ডেশনের Recovery and Advancement of Informal Sector Employment (RAISE) প্রকল্পের আওতায় ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে পুনরায় ব্যবসাকে চাঙ্গা করেন।
বর্তমানে রিনার ৪টা তাঁতে এক থেকে দেড় মাসে ৪টা জামদানি শাড়ি তৈরি হয়। বর্তমানে রিনার তাঁতে দুই জন পূর্ণকালীন এবং একজন খন্ডকালীন তাঁতি কাজ করছেন। পূর্ণকালীন দুইজন তাঁতিকে তৈরিকৃত শাড়ির অর্ধেক মূল্যের সমান এবং খন্ডকালীন তাঁতিকে সপ্তাহে ২৫০০ টাকা পারিশ্রমিক দেন। রিনা এখন মাসে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা আয় করছেন এবং নিজেদের থাকার জন্য একটি বাড়িও কিনেছেন। রেইজ প্রকল্পের অধীনে ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায় ধারাবাহিকতা’ বিষয়ক প্রশিক্ষণ থেকে কিভাবে ব্যবসার পরিকল্পনা করতে হয় তা জেনেছেন। ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বুঝেছেন এবং হিসাব রাখতে শিখেছেন। রিনা তার বাড়ির সামনে ফাঁকা জায়গাতে একটি শো-রুম করার পরিকল্পনা করছেন যাতে করে শাড়ি বিক্রির জন্য মহাজনের উপর নির্ভর করতে না হয়।
ওয়েভ ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে রিনা বলেন, “ওয়েভের লোন পেয়ে ম্যালা উপকার হইছে, টেকাডা ব্যবসার কাজে লাগাতে পারছি। আর আমরা যে ট্রেনিংডা করছি সুযোগ পালি এ রকম আরও ট্রেনিং করতে চাই, যা সত্যই আমাদের অনেক কাজে দিছে।” রিনার ইচ্ছা, তার তাঁতে আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। সকলে মিলে এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারলে দেশে-বিদেশে জামদানির সুনাম ছড়িয়ে পড়বে।