দেশে বাড়তে থাকা আয় বৈষম্য কমাতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কাঠামোগত সংস্কার, নগর দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং এতে বরাদ্দ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছেন দেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকগণ। ২৬ জুন রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ নেটওয়ার্ক আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় তারা এসব সুপারিশ তুলে ধরেন। ‘আয় বৈষম্য দূরীকরণে জাতীয় বাজেট ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক এবং ওয়েভ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সাইদুর রহমান খান। সম্মানীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এম এম আকাশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএস এর গবেষণা পরিচালক ড. এস এম জুলফিকার আলী। সভা সঞ্চালনা ও স্বাগত বক্তব্য দেন নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী এবং ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক কানিজ ফাতেমা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, “আমাদের কাছে বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী, বেদে জনগোষ্ঠীসহ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর ডাটাবেজ রয়েছে। সেখানে প্রায় ৩৬ লক্ষ প্রতিবন্ধী রয়েছেন। সামাজিক সুরক্ষায় ২০১৩ সালের নীতিমালা রয়েছে, সেগুলো দিয়ে আমরা আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি। বিভিন্ন ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান নগদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে যারা জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। আমরা দুদকের মাধ্যমে মামলা দিয়ে এই দায়িত্ব থেকে তাদের অব্যাহতি দিয়েছি। বর্তমানে ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে অভিযোগের মাত্রা কমে এসেছে। একই ব্যক্তি যাতে দুই জায়গায় ভাতা নিতে না পারেন, এ দ্বৈততা পরিহারে আমরা কাজ করছি।“
সভাপতির বক্তব্যে মহসিন আলী বলেন, “৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার কীভাবে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে, তা দেখার বিষয়। ২০১৫ সালে প্রণীত জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল বা এনএসএসএস একটি ভালো উদ্যোগ হলেও এর কর্মসূচিগুলোতে উপকারভোগী নির্বাচন এখনও অস্পষ্ট। খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করা সামাজিক সুরক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য, যা নিয়ে ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ কাজ করছে।” তিনি আশাবাদী যে, “খাদ্য অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করে দেশের উন্নয়নে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম চলবে।“
প্রবন্ধ উপস্থাপক এবং আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ২০১৫ সালে গৃহীত এনএসএসএস এখনও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। বরং একই লক্ষ্য নিয়ে একাধিক কর্মসূচি চলছে, যেগুলো পরস্পরবিরোধী এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। বর্তমান বাজেটে সামাজিক সুরক্ষায় মোট ১ লক্ষ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে যা জিডিপির ১.৮৭ শতাংশ। তবে সরকারি কর্মচারিদের পেনশন, কৃষি ভর্তুকী, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, এবং পাঠ্যবই বিতরণ বাবদ প্রদত্ত অর্থ বাদ দিলে এ বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫৭ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ শতাংশেরও নিচে নেমে আসে, যা অত্যন্ত অপ্রতুল। বক্তারা বলেন, নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে, এবং উপকারভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব দূর করে প্রকৃত দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উপকারভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পদ্ধতি নিশ্চিতকরণ, ভাতার পরিমাণ দারিদ্র্যসীমার সমপর্যায়ে উন্নীত এবং নাগরিক নজরদারির ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে উপকারভোগী নির্বাচন ও বিতরণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা এবং সামাজিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার। এ কার্যক্রমের অনেক কর্মসূচি পরস্পরবিরোধী ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তাই অবিলম্বে পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত কর্মসূচি বাদ দেওয়ার তাগিদ দেন তারা। আলোচনা সভায় বিভিন্ন পেশাজীবী, যুব প্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।



